মার্কিন প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতিতে বাধা হতে পারে এইচ-১বি ভিসা ফি

বিদেশী দক্ষ কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য মার্কিন এইচ-১বি ভিসানীতিতে পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে দেশটির প্রযুক্তি খাতে।

বিদেশী দক্ষ কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য মার্কিন এইচ-১বি ভিসানীতিতে পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে দেশটির প্রযুক্তি খাতে। এ ভিসা স্কিমে বাড়তি ফি ঘোষণার পর এ খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সাবধানতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তুলনামূলক ছোট পুঁজি ও নতুন স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো, যা দেশটির প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতিতে বাধা তৈরি করতে পারে। দক্ষ বিদেশী কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রমুখী হওয়ার হার কমে গেলে এর সুবিধা নিতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো। খবর এফটি ও সিএনএন।

গত শুক্রবার মার্কিন নির্বাহী এক আদেশে বলা হয়েছিল, এইচ-১বি ভিসার জন্য প্রতি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে বছরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে ১ লাখ ডলার দিতে হবে। এতদিন প্রশাসনিক খরচ মিলিয়ে এ ভিসা ফি ছিল প্রায় দেড় হাজার ডলার।

খবরটি প্রকাশ হতেই যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত এইচ-১বি ভিসাধারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মাইক্রোসফট, জেপি মরগান, অ্যামাজনসহ শীর্ষ মার্কিন কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশনা দেয়।

অবশ্য পরদিন শনিবার জানানো হয়, ঘোষিত ১ লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসা ফি শুধু নতুন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘‌এটি কোনো বার্ষিক ফি নয়। বরং এককালীন ফি, যা কেবল নতুন ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রেই দিতে হবে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেন। তখন বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর বৃহৎ শুল্ক আরোপ করেন তিনি। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন কেন্দ্র সম্প্রসারণ করা। এবার এইচ-১বি ভিসানীতি প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো মার্কিন কোম্পানিতে স্থানীয় কর্মী নিয়োগে উৎসাহদান এবং বিদেশী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বার্তা দেয়া।

গত বছর প্রায় চার লাখ এইচ-১বি আবেদন অনুমোদন করে যুক্তরাষ্ট্র। যার বেশির ভাগ ছিল ভিসা নবায়নের আবেদন। শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এইচ-১বি ভিসানীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের তথ্যানুযায়ী। সর্বশেষ আর্থিক বছরে, জায়ান্ট কোম্পানি দুটি ১৫ হাজারের বেশি কর্মীর জন্য এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন পেয়েছিল। এছাড়া গুগল, মেটা ও অ্যাপল যথাক্রমে ৫ হাজার ৩৬৪, ৪ হাজার ৭২৫ ও ৩ হাজার ৮৭৩টি ভিসার অনুমোদন পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের প্রধান কেন্দ্র সিলিকন ভ্যালি। এখানকার কোম্পানিগুলো ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী ও প্রোগ্রামার নিয়োগের ক্ষেত্রে এইচ-১বি ভিসার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। অথচ এ জায়ান্টগুলোই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আরোহণের শুরুতেই সমর্থন দিয়েছিল। অবশ্য অস্থায়ী এ ভিসা অ্যাকাউন্টিং ফার্ম ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেও অতিপ্রচলিত।

নতুন ফি মার্কিন নাগরিকদের জন্য চাকরি সৃষ্টি করবে এমন বার্তা নিয়ে সতর্ক করেছেন অনেক সমালোচক। তাদের মতে, এ ভিসানীতি প্রতিভাবান উদ্ভাবককে অন্য দেশে ঠেলে দিতে পারে।

স্টার্টআপ খাতের প্রতিষ্ঠান ওয়াই কম্বিনেটরের সিইও গ্যারি ট্যানের মতে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি ত্রুটিপূর্ণ। কারণ এটি মার্কিন স্টার্টআপগুলোর পা কেটে দিচ্ছে। পাশাপাশি কানাডার ভ্যানকুভার ও টরন্টোসহ সব বিদেশী প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলোর জন্য বড় উপহার হতে যাচ্ছে এটি।

অ্যামাজন, মেটা, অ্যাপল ও গুগলের প্রযুক্তি খাতের এ চার জায়ান্টের মোট বাজার মূলধন প্রায় ১১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে কর্মী নিয়োগে বাড়তি খরচ হলেও তারা অনেকটা সামাল দিতে পারবে। মূল ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রযুক্তি ছোট ব্যবসা ও স্টার্টআপগুলো। নতুন ফি এসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশী কর্মীদের এন্ট্রি-লেভেল পদে প্রবেশের জন্য বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ তাদের দেয়া বেতনের তুলনায় ১ লাখ ডলার অনেক বেশি।

এদিকে কানাডার বিজনেস কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট গোল্ডি হায়দার বলেছেন, দক্ষ কর্মী আকর্ষণে কানাডার প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করতে হবে। টরন্টোভিত্তিক আলেক্স ট্যাপস্কট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ ক্ষতি হতে পারে কানাডার লাভ। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি পরিবর্তন কানাডাকে বৈশ্বিক প্রতিভাদের জন্য প্রাধান্যপ্রাপ্ত গন্তব্যে রূপান্তর করতে পারে।

এইচ-১বি ভিসানীতির পরিবর্তনে বেশি ক্ষতির শিকার হতে পারে ভারত। কারণ এ ভিসার প্রধান গ্রহীতা ভারতীয়রা। হোয়াইট হাউজের ঘোষণার দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভিসানীতির এ পরিবর্তন নির্ভরশীল ভারতীয় পরিবারগুলোর জন্য মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

চীনের পেশাজীবী, গবেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মার্কিন এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ ফি বৃদ্ধি নতুন বা ছোট প্রকল্পের জন্য তাদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সম্ভাবনা কমাবে। ফলে চীনা প্রযুক্তি কর্মীরা দেশেই থাকবেন বা অন্য দেশে কাজ খুঁজবেন বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। আরো বলছেন, নতুন ফি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা কঠিন করে তুলতে পারে। যেসব কর্মী যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারত, তারা এখন চীন বা অন্য দেশে যেতে পারেন। এটি এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগামী অবস্থানের গতি কমাবে।

অবশ্য ভিসানীতির পরিবর্তনে আইনি জটিলতা পড়তে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, সম্প্রতি শুল্ক আরোপ নিয়ে যেমনটা হয়েছে। গবেষণা সংস্থা আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের (এআইসি) সিনিয়র ফেলো অ্যারন রেইখলিন-মেলনিক বলেন, ‘স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, ভিসার ওপর ১ লাখ ডলার ফি আরোপ করার কোনো আইনি ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই।’

আরও